Saturday, 1 February 2020

'কল্প বিজ্ঞান' ভবিষ্যৎ সেরকম নয় যেরকম আমরা সিনেমাতে দেখি



কল্প বিজ্ঞান
ভবিষ্যৎ সেরকম নয় যেরকম আমরা সিনেমাতে দেখি



মানুষ এই বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে কারণ তারা অন্যান্য যে কোন পশুর থেকে বেশি ভালো ভাবে একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে, এবং তারা এই সহযোগিতা করতে পারে কারণ তারা গল্পে বিশ্বাস করে। একজন গল্পকার, কবি বা ছবি আঁকিয়ে, অথবা একজন নাট্যকার প্রত্যকেই একজন সৈনিক এবং একজন ইঞ্জিনিয়ারের মতই গুরুত্বপূর্ণ । মানুষ যুদ্ধে যায় এবং মানুষ মন্দির মসজিদ তৈরি করে কারণ তারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, এবং তারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে কারণ তারা ঈশ্বরের সম্পর্কে কবিতা পড়েছে, গল্প শুনেছে। ঈশ্বরের ছবি দেখেছে। একই ভাবে আমরা ধনতন্ত্র নামক আধুনিক পুরাণ কেও বিশ্বাস করি যা কিনা সিনেমা গান ইত্যাদি শিল্পের দ্বারা সৃষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি বেশি বেশি পণ্য দ্রব্য কেনা আমাদের আনন্দ দিতে পারে কারণ আমরা স্বচক্ষে ধনতন্ত্রের স্বর্গ প্রতক্ষ্য করছি টিভির বা মিডিয়ার মাধ্যমে।
      সম্ভবত একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক সাহিত্য ও সিনেমার ধারা হল সায়েন্স ফিকশান বা কল্প বিজ্ঞান। খুবই নগণ্য সংখ্যক মানুষ মেশিন লার্নিং অথবা জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে আপডেটেড খোঁজ খবর রাখে বা পড়াশুনা করে। পরিবর্তে ‘The Matrix’ বা Her’ এর মত সিনেমা বা Westworldবা ‘Black Mirror’ মত টিভি সিরিজ মানুষকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে বর্তমান- সময়ের প্রযুক্তির উন্নতির সম্পর্কে ধারনা দেয়, এর মানে হল সায়েন্স ফিকশানকে অনেক বেশি দায়িত্ব নিতে হবে প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরার জন্য নতুবা মানুষের কাছে ভুল ধারনা পৌঁছবে প্রযুক্তিগত বাস্তবতা সম্পর্কে এবং এর ফলে মানুষ সত্যিকারের অসুবিধাগুলি ছেড়ে ভুল অসুবিধারগুলির প্রতি ফোকাসড হয়ে পড়বে সম্ভবত এখনকার কল্পবিজ্ঞানের সবথেকে বড় পাপ হচ্ছে এইগুলি আমাদের চেতনাবা চৈতন্যেরসাথে বুদ্ধিমত্তাব্যাপারটাকে গুলিয়ে দেয় যার ফলে আমরা মাত্রারিক্ত উদ্বিগ্ন হই মানুষ ও মেশিনের সম্ভাব্য যুদ্ধ সম্পর্কে কিন্তু আমরা উদ্বিগ্ন হই না জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে যেই প্রযুক্তির ফলে মানুষের জিন সম্পাদনা করে তৈরি হতে পারে সুপার হিউম্যান ধনবান শ্রেনী বা আপার ক্লাস নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে সুপার ইউম্যান হিসেবে গড়ে তুলবে কারণ এর সুবিশাল খরচটা তারাই বহনে সক্ষম এবং মেধা ও ক্ষমতা ব্যপারটা একান্তভাবেই কুক্ষিগত হয়ে পড়বে এই ধনবান শ্রেনীর এই দিক থেকে দেখতে গেলে বেটার ফিউচারের বর্ণনাকার হিসেবে স্টিভেন স্পিলবার্গের চেয়ে কার্লমার্ক্স অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ



প্রকৃতপক্ষে বেশিরভাগ আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সি সম্পর্কিত সিনেমাগুলি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা থেকে এতটাই দূরে যে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু বর্ণনা করে রূপকের মত করে, যেমন ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত Ex Machina সিনেমাটির কথাই ধরা যাক, এখানে দেখানো হয়েছে একজন পুরুষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সির বিজ্ঞানী কে যিনি প্রেমে পড়ে যান একজন স্ত্রী রোবোটের এবং এই স্ত্রী রোবটটি এই পুরুষ বিজ্ঞানীকে মন্ত্রমুগ্ধ করে নিজের আখের গোছানোতে ব্যাবহার করে নেয় এখানে ব্যাপার হচ্ছে উক্ত সিনেমাটি মোটেই বুদ্ধিমান রোবট মনুষ্য সমাজে দ্বন্দ্ব বা ভয় নিয়ে নয় এখানের দ্বন্দ্ব বা ভয়টা হচ্ছে একজন বুদ্ধিমান নারীর সাথে একজন পুরুষের আরো বৃহত্তর দৃষ্টিতে গেলে ভয়টা পুরুষ শাসিত সমাজের, এবং সেই শাসন ক্ষমতা নারীদের হাতে চলে যাবার ভয় সিনেমাটি যতটা না AI সম্পর্কিত তাঁর থেকে অনেক অনেক বেশি নারীবাদ সম্পর্কিত কারণ একটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সির আবার নারী পুরুষ কী?


বাক্সের মধ্যে বন্দী হয়ে পরা




কল্পবিজ্ঞান যে প্রযুক্তিগত বিপদটি দুর্দান্তভাবে ধরতে পেরেছে সেটি হল মনুষ্য জাতির  প্রযুক্তির দ্বারা ব্যাবহৃত হওয়া “The Matrix” সিনেমাটি আমাদের কাছে এমন একটি সময়ের কথা বর্ণনা করে যেখানে পুরো মনুষ্যজাতি বন্দী হয়ে পড়েছে সাইবার স্পেসদ্বারা, এবং মনুষ্য জাতির প্রতিদিনের ব্যাবহারিক জীবনের যে সমস্ত অভিজ্ঞতা তার সবটাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এইসাইবার স্পেসনামক মাস্ট্রার প্রোগ্রামের দ্বারা ‘The Truman Show’ সেই লোকটির কথা বলে যে নিজেই জানে না সে হল একটি রিয়েলিটি শো এর একজন অভিনেতা মাত্র, তার মা বাবা তার বন্ধু বান্ধব সবাই এক একজন অভিনেতা তার জীবনে যা ঘটছে সবটাই ওয়েল স্ক্রিপ্টেড এবং সবটাই লুকানো ক্যামেরার দ্বারা রেকর্ড হচ্ছে ও এই শো এর লক্ষ লক্ষ ভক্ত তাকে ফলো করছে

এই দুটো ব্রিলিয়ান্ট সিনেমাই আমাদের সেই সময়ের কথা বোঝাতে চেয়েছে, যখন মানুষ প্রযুক্তির জ্বালে আটকে পড়েছে এবং সেই প্রযুক্তি নিজের মত তাদেরকে ব্যাবহার করছে এবং প্রযুক্তির এই প্রোগামিং এর বাইরে যে আরেকটি অল্টারনেটিভ বাস্তবতা আছে সেই বাস্তবতায় শুধু মাত্র সত্যিকারের হিরোরা পৌঁছতে পারবে তাদের অতিমানবীয় চেষ্টার দ্বারা।  the matrix এর সাইবার স্পেস কেবল মাত্র একটি প্রোগ্রাম, এমন একটি কারাগার যেটা আমাদেরকে নিজেদের ভেতরের নিজস্বতা  থেকে বাইরের বাস্তব পৃথিবীকে আলাদা রাখে। যখন নিও ম্যাট্রিক্স সিনেমার সেই বিখ্যাত লাল ট্যাবলেট খেয়ে ম্যাট্রিক্সের প্রোগামিং এর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে সে তখন আবিস্কার করে যে বাইরের পৃথিবী ও ম্যাট্রিক্সের প্রোগামিং এর জগতের মধ্যে তেমন কিছু পার্থক্য নেই ।ম্যাট্রিক্সের ভেতর ও বাইরে দুটো জগতের মধ্যেই প্রবল দ্বন্দ্ব ছেয়ে আছে এবং মানুষজন হিংসা, ভয়, ভালোবাসা, কাম এবং দ্বেষ দ্বারা চালিত হচ্ছে ।

সিনেমাটি শেষ হওয়া উচিৎ ছিল নিওর মুখে এই সংলাপ দিয়ে যে বাস্তব পৃথিবী হল আরো একটা বড় ম্যাট্রিক্স আসলে বাস্তব পৃথিবী আরো বড় একটা প্রোগামিং। যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত প্রোগ্রামিং হচ্ছি । যেখানে টিভির ফেয়ার এন্ড লাভ্লির অ্যাড আমাদের মনকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কালো ও সাদা রঙের মধ্যে কে বেশি সফল হবে, শাহরুখ খানের ফেয়ারএন্ড হ্যান্ডসাম এর অ্যাড আমাদের মনের গভীরতম অংশে গেঁথে দিচ্ছে সেই ধারনা যেই ধারনায় সুন্দর মানেই হবে ফর্সা, কালোরা ঠিক সুন্দর না। মনের মধ্যে প্রোগ্রামিং করা হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ। 


লেটেস্ট টেকনোলজি ও সমসাময়িক বিজ্ঞানের বিপ্লবের ফলে বোঝা যাচ্ছে খাঁটি সত্যকেও আমরা ভুল প্রমান করতে পারি এবং মানুষকে মিথ্যেটা বোঝাতে পারি  টিভি ক্যামেরার দ্বারা, একটু একটু করে  ধাপে ধাপে।(বর্তমান ভারতীয় মিডিয়া পদে পদে তাই প্রমান করছে) মানুষ একটা বাক্সের মধ্যে আঁটকে যেতে ভয় পায় (টিভির নাম দিল বোকা বাক্স), কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যে তারা আগে থেকেই একরকম বাক্সের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে – সেই বাক্সটা হল তাদের ব্রেন, এই ব্রেন নামক বাক্সটা আবার একটা বড় মত বাক্সের ভেতর বন্ধ করা আছে যেটা হল মনুষ্য সমাজ এবং সেই সমাজের অগণিত অলীক কাহিনী। সম্ভবত আমরা সমস্ত জীবিত প্রানীরা বাস করছি একটা মিথ্যে জায়েন্ট প্রোগ্রামিং এর ভেতরে, অনেকটা ‘The Matrix’ সিনেমার Matrix স্টাইলে। এতসব কিছুর পরও আমাদের মানসিক অভিজ্ঞতা গুলি কিন্তু বাস্তব যদি কোনদিন দেখা যায় যে মনুষ্য জাতির ইতিহাস কেবল মাত্র একটি সম্প্রসারিত নকল একটি প্রোগ্রামিং  যেটা চালিত হয়েছে অন্য কোন বুদ্ধিমান গ্রহের কোন বিজ্ঞানীর দ্বারা তাহলে সেটা খুবই হাস্যকর হয়ে যাবে কার্ল মাক্স এবং ইসলামিক স্টেটের পক্ষে। কিন্তু তবুও সেই বুদ্ধিমান গ্রহের বিজ্ঞানীকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও আর্মেনীয় গণহত্যার সাপেক্ষে । কারণ ব্যাথা্র  অনুভব ব্যাথাই, ভালোবাসার অনুভব ভালোবাসাই সেটা প্রোগ্রামিং এর ভেতরে হোক কি সেটা প্রোগ্রামিং এর বাইরে, সুতরাং এটা কোন ম্যাটার করেই না যে আমাদের ব্যাথা বেদনা ভয় ভালোবাসার অনুভব সেটা কোন সমষ্টি গত পরমাণুর ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে, নাকি কোন কম্পিউটারের ইলেক্ট্রিক সিগন্যালের ফলে। সত্যিই যদি আমরা আমাদের মনের বাস্তবতা কে আবিষ্কার করতে চাই তাহলে আমরা সেটা ম্যাট্রিক্সের ভেতরে থেকেও করতে পারি আবার বাইরে থেকেও পারব।


Yuval Noah Harari বই 21 Lession For The 2st Century কল্প বিজ্ঞানভবিষ্যৎ সেরকম নয় যেরকম আমরা সিনেমাতে দেখি'চ্যাপ্টার থেকে আংশিক ভাবানুবাদ '

No comments:

Post a Comment